Breaking News

সিএননের বিশ্লেষণ, তুরস্কের সঙ্গে ইসরাইলের ‘যুদ্ধ’ আসন্ন?

নিউজবাংলা ডট নেট ডেক্স।।
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

সিএননের বিশ্লেষণ

তুরস্কের সঙ্গে ইসরাইলের ‘যুদ্ধ’ আসন্ন?

 

তেলআবিবের প্রধান মহাসড়কের পাশে বিশাল একটি বিলবোর্ডে সম্প্রতি তুরস্ককে সরাসরি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছিল। ওই বিলবোর্ডে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে ইরান, হিজবুল্লাহ ও নিউইয়র্ক সিটির মেয়রের ছবি দেখানো হয়।তাদের ইসরাইলের প্রতিপক্ষ হিসেবে তুলে ধরে লেখা ছিল- ‘তারা চায় নেতানিয়াহু হেরে যাক। তাদের জিততে দেবেন না।’

এর কয়েক দিন পরই ইসরাইলের সর্বশেষ সামরিক উত্তেজনার কেন্দ্রেও পরিণত হয় তুরস্ক।ইসরাইলি যুদ্ধবিমান উত্তর সিরিয়ার আবু আল-দাহার বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায়। ইসরাইলি কর্মকর্তারা দাবি করেন, সেখানে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি গড়ে ওঠার প্রস্তুতি চলছিল, যা ইসরাইলের কাছে বড় ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
তবে নির্বাচনের আর মাত্র দুই মাসের বেশি সময় বাকি থাকায় নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারের সঙ্গে হামলার সময়ের ঘনিষ্ঠতা ইসরাইল ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।

প্রশ্ন উঠেছে, নেতানিয়াহু কি সত্যিকারের কৌশলগত হুমকি ঠেকাতে আগাম পদক্ষেপ নিচ্ছেন, নাকি নির্বাচনে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে হুমকিটিকে আরও বড় করে দেখাচ্ছেন?দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি অংশজুড়ে নেতানিয়াহু নিজেকে ‘মিস্টার সিকিউরিটি’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। যিনি ইসরাইলের সামনে থাকা যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় সক্ষম। একই সঙ্গে তিনি একজন দক্ষ রাজনৈতিক কৌশলবিদ, যিনি সংকটকে রাজনৈতিক সুবিধায় রূপ দেয়ার দীর্ঘ ইতিহাসও রাখেন।
সিরিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাপডকাস্টার মারিও নওফালের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ব্যারাক হামলার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন। তিনি একটি ‘তত্ত্বের’ কথা তুলে ধরে বলেন, ইসরাইল হয়তো ‘তুরস্ককে উসকে দেয়ার চেষ্টা করেছে’।
তার ভাষায়, এটি ছিল ‘খুবই আগ্রাসী পদক্ষেপ, তবে নির্বাচনের আগে এটি রাজনৈতিকভাবে ভালো ফল দিতে পারে।’ম্পের দূত এবং তুরস্কে মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম ব্যারাক হামলার বিষয়ে বিরল প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন। তিনি এটিকে ‘অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা বৃদ্ধি’ বলে অভিহিত করেছেন।তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইল হামলাটিকে নিছক সামরিক প্রয়োজন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। নেতানিয়াহু ও তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ উভয়েই বলেছেন, ইসরাইলি গোয়েন্দারা জানতে পেরেছিল যে তুরস্ক বিমানঘাঁটিটিতে সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর একটি সূত্র সিএনএনকে জানায়, বিমানঘাঁটিতে তুরস্কের সেনাসদস্য, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের পরিকল্পনা সম্পর্কে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করেছিল।

ওই সূত্রের দাবি, তুরস্ক সেখানে এ ধরনের সামরিক উপস্থিতি গড়ে তুললে সিরিয়ার আকাশসীমায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান পরিচালনার স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে এবং ওই অঞ্চলের কৌশলগত ভারসাম্যও বদলে যেতে পারে।

আরেকটি সূত্র জানায়, এসব গোয়েন্দা তথ্য ট্রাম্প প্রশাসন এবং সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিল ইসরাইল।

গত এক বছর ধরে ইসরাইল ও সিরিয়ার মধ্যে সংঘাত এড়ানোর লক্ষ্যে আলোচনা চলছে। নেতানিয়াহু এ আলোচনার মাধ্যমে নিরাপত্তা বিষয়ে একটি ‘স্থিতাবস্থা’ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন।

সর্বশেষ উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টায় রোববার ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান রোমান গফম্যান জর্ডানে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানির সঙ্গে আবারও বৈঠক করেছেন বলে জানিয়েছে সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা।

তবে তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র এবং নেতানিয়াহুর কয়েকজন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হামলার সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

ইসরাইলের ব্যাখ্যাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে তুরস্ক অভিযোগ করেছে, অক্টোবরের নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু ‘অঞ্চলে সম্প্রসারণবাদী ও অস্থিতিশীলতামূলক নীতি’ অনুসরণ করছেন।

তুরস্কের সরকার জানিয়েছে, শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার বৈধ প্রচেষ্টায় তারা সিরীয় সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।

নেতানিয়াহু ও কাটজ হামলার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। বরং তারা সিরিয়ায় তুরস্কের সম্ভাব্য সামরিক উপস্থিতির বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

নেতানিয়াহু গত সপ্তাহে বলেন, সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি শেকড় গেড়ে ইসরাইলের জন্য হুমকি তৈরি করুক, আমরা তা মেনে নেব না। এরই মধ্যে এরদোয়ানের বিরুদ্ধে নিজের কঠোর বক্তব্য আরও জোরালো করেছেন নেতানিয়াহু।

শুক্রবার নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক্সে দেয়া এক পোস্টে এরদোয়ানকে ‘নিজ দেশের জনগণকে নিপীড়নকারী ইহুদিবিদ্বেষী স্বৈরশাসক’ বলে অভিহিত করে।
নেতানিয়াহু ও এরদোয়ানের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রকাশ্য বিরোধ রয়েছে। গাজা, লেবানন ও ইরানের যুদ্ধের সময় সেই বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। এরদোয়ান নেতানিয়াহুকে যুদ্ধাপরাধী বলে অভিহিত করেছেন এবং গাজায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে বারবার নৃশংসতার অভিযোগ তুলেছেন।

অন্যদিকে নেতানিয়াহু এরদোয়ানের বিরুদ্ধে হামাসকে সমর্থনের অভিযোগ করেছেন।

সম্প্রতি তুরস্কের কাছে মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির বিরোধিতা করেন নেতানিয়াহু। এ সময় তিনি অঞ্চলটিতে এরদোয়ানের ‘আগ্রাসী উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ নিয়ে সতর্ক করেন।

বামপন্থি ইসরাইলি সংবাদপত্র হারেৎজের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা বিশ্লেষক আমোস হারেল মনে করেন, হামলার পেছনে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক দুই ধরনের কারণই থাকতে পারে।

রাজনৈতিক আলোচনা

তার মতে, ইসরাইলের বিরুদ্ধে এরদোয়ানের অবস্থান অত্যন্ত বৈরী হওয়ার যথেষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। একই সঙ্গে সিরিয়ায় তুরস্ক বিভিন্ন সামরিক পদক্ষেপ নিচ্ছে, যার কিছু নিয়ে আইডিএফ উদ্বিগ্ন।

হারেল বলেন, তুরস্কের সামরিক উপদেষ্টা, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েনের পরিকল্পনা সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।

হারেলের মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইল হামলা থেকে নেতানিয়াহু যে শিক্ষা নিয়েছেন, তার মূলনীতি হলো প্রতিটি ফ্রন্টে আগে হামলা চালানো এবং একই সঙ্গে গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলের সীমান্ত বরাবর নিরাপত্তা বাফার জোন প্রতিষ্ঠা করা।

২০২৪ সালে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর ইসরায়েল সিরিয়ার ভেতরে প্রায় ৪০০ বর্গকিলোমিটারের একটি বাফার জোন দখল করে নেয় এবং সেটি এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

হারেল বলেন, ‘নেতানিয়াহু মনে করেন, নিরাপত্তাজনিত জরুরি পরিস্থিতি শেষ মুহূর্তের এমন একটি বিকল্প, যা রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি বদলে দিতে এবং নির্বাচনে টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।’

তার মতে, ট্রাম্প ইসরাইলের ইরান যুদ্ধ এবং গাজা ও লেবাননে সামরিক অভিযান সীমিত করার পর তুরস্ক-সিরিয়া একটি সম্ভাব্য নতুন ফ্রন্টে পরিণত হতে পারে।
আর এ কারণেই সর্বশেষ উত্তেজনার পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনাও রয়েছে এমন ‘জোরালো সন্দেহ’ অন্তত উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।

বিষয়:

এলাকার খবর

সম্পর্কিত

// Facebook Graph API URL