চকরিয়া-মাতামুহুরীর মানুষ পানিবন্দি বিপর্যস্ত, খাবার ও পানি তিব্র সংকট, বৃষ্টি না হওয়ায় পানি কমতে শুরু করেছে ।। মোহাম্মদ উল্লাহ।। টানা ৭ দিনের রেকর্ড ভাঙা প্রবল বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় দুই উপজেলার অন্তত ১৮ টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বন্যার কারণে দুই উপজেলা ও একটি পৌরসভার সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। বন্যা কবলিত অঞ্চলে দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্যমতে,বান্দরবানের লামা ও আলীকদম উপজেলা থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা (১১.৮০ মিটার) অতিক্রম করে ১১.৯৪ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে। তীব্র স্রোতের কারণে মাতামুহুরী উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী ও মরণঘোনা এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। ফলে হু হু করে বানের পানি ঢুকে নতুন নতুন গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে। শতাধিক গ্রাম এখন পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট,চুলো জ্বলছে না ঘরে। চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের প্রতিদিনের বাংলাদেশ এর প্রতিনিধি মুহাম্মদ ওসমান সরওয়ার জানান, বিভিন্ন লোকজনের বাড়িতে পানি ঢুকার কারণে রান্নাবান্না সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। চকরিয়া পৌরসভা বিএনপির ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি মঈন উদ্দিন জানান, গত ৬ দিন ধরে পানিবন্দি অবস্থায় ঘরে আটকে এলাকার জনগন। শুকনো খাবার ও শিশুদের জরুরি পুষ্টির সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া গ্রামীণ এলাকার নলকূপ ও পানির উৎসগুলো মাতামুহুরী উপজেলার বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ শোয়াইবুল ইসলাম সবুজ জানান, ক্রমাগত বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। বসতঘর পানিতে ডুবে যাওয়ায় রান্নাবান্না হচ্ছে না। বিশুদ্ধ খাবার পানিরও সংকট দেখা যাচ্ছে দুই উপজেলার বন্যায় প্লাবিত নিম্নাঞ্চলে। যা স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পানিবাহিত রোগ ছড়ানোর শঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দুই উপজেলায় এ পর্যন্ত ৫জন শিশু মৃত্যু হয়েছে। প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানিতে চকরিয়া-মহেশখালী সংযোগ সড়কসহ অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ গ্রামীণ সড়কগুলো তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। মাঠের পর মাঠ আমনের বীজতলা, মৌসুমি সবজিখেত এবং শত শত মৎস্য ঘের পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় চাষি ও খামারিরা কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ার আশংকা রয়েছে। চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বলেন, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন সর্বোচ্চ তৎপর রয়েছে। তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি তদারকির জন্য একটি জরুরি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ,ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যার তুলনায় সরকারি এই সাহায্য অত্যন্ত অপ্রতুল। অপরদিকে জেলায় চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে দুর্গত মানুষের নিরাপদ পানির চাহিদা পূরণে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উদ্যোগে চকরিয়া পৌরসভাসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে মোবাইল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের মাধ্যমে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। বন্যার কারণে বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়া পরিবারগুলোর মাঝে এ কার্যক্রমের আওতায় নিরাপদ খাবার পানি বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি স্যানিটেশন সেবা নিশ্চিত করতেও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। এ সময় সরেজমিনে উপস্থিত থেকে কার্যক্রম পরিদর্শন করেন চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রূপায়ণ দেব, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা দিলিপ বড়ুয়া, উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী ইফতেখারুল আলম এবং উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আল-আমিন বিশ্বাসসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বন্যাকবলিত এলাকায় সুপেয় পানির সংকট নিরসনে মোবাইল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের মাধ্যমে বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে, যাতে দুর্গত মানুষ নিরাপদ পানি পেয়ে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারে।