যুদ্ধের সময় বাংলাদেশে গণহত্যা হয়েছে এ বিষয়টির স্বীকৃতি দিতে মার্কিন কংগ্রেসে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান। পাশাপাশি এতে তিনি বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার দাবি জানিয়েছেন। প্রস্তাবটি কমিটি অন ফরেন অ্যাফেয়ার্সে পাঠানো হয়েছে। ১১৯তম কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে ২০শে মার্চ উত্থাপিত এই প্রস্তাবনা হলো রেজ্যুলুশন ১১৩০। এতে বলা হয়, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং গণহত্যার ঘটনাগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে স্মরণ ও নথিবদ্ধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে ভুক্তভোগীদের স্মৃতি সংরক্ষিত থাকে এবং ভবিষ্যতে এমন নৃশংসতা প্রতিরোধ করা যায়। তাই প্রস্তাব করা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ (১) ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে যে নৃশংসতা চালিয়েছে তার যেন তীব্র নিন্দা জানায়। (২) প্রতিনিধি পরিষদ যেন স্বীকৃতি দেয় যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের ইসলামপন্থী মিত্ররা ধর্ম ও লিঙ্গ নির্বিশেষে জাতিগত বাঙালিদের নির্বিচারে গণহত্যা করেছে, তাদের রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও শিক্ষার্থীদের হত্যা করেছে এবং দশ হাজারেরও বেশি নারীকে যৌন দাসত্বে বাধ্য করেছে। একই সঙ্গে তারা বিশেষভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের টার্গেট করে গণহত্যা, গণধর্ষণ, জোরপূর্বক ধর্মান্তর এবং বলপূর্বক দেশত্যাগের মাধ্যমে নির্মূল করার চেষ্টা চালিয়েছে। (৩) এটিও যেন প্রতিনিধি পরিষদ স্বীকার করে যে কোনো জাতিগত গোষ্ঠী বা ধর্মীয় সম্প্রদায় তাদের সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধের জন্য সমষ্টিগতভাবে দায়ী নয়। (৪) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে প্রতিনিধি পরিষদ যেন আহ্বান জানায়, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের সহযোগী জামায়াতে ইসলামীর দ্বারা জাতিগত বাঙালি হিন্দুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য।
প্রস্তাবনায় ওই সময়ের ইতিহাস তুলে ধরে বলা হয়, ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে বৃটিশ শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারত উপমহাদেশে দুটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান গঠিত হয়। পাকিস্তানের মধ্যে ছিল ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন দুটি অঞ্চল। এর একটি পশ্চিম পাকিস্তান (বর্তমান পাকিস্তান) ও পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবি অভিজাতদের দ্বারা গঠিত ছিল। তারা দেশের বেশির ভাগ সম্পদ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পশ্চিম পাকিস্তানেই কেন্দ্রীভূত করে। পশ্চিম পাকিস্তানের কর্মকর্তারা বাঙালিদের প্রতি সুস্পষ্টভাবে বিদ্বেষ পোষণ করতেন। বাঙালিদেরকে নিম্নতর জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করতেন। ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে কেন্দ্র করে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পাকিস্তানের তখনকার প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান, পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টো এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য অনুষ্ঠিত আলোচনা ব্যর্থ হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে। জামায়াতে ইসলামীর আদর্শে অনুপ্রাণিত উগ্র ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সহযোগিতায় পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে অপারেশন সার্চলাইট নামে একটি সামরিক অভিযান শুরু করে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী। এতে ব্যাপক বেসামরিক জনগণকে হত্যা করা হয়। এসব নৃশংসতায় নিহত মানুষের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হিসাব অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা কয়েক লাখ। ২ লাখেরও বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হন। সামাজিক কলঙ্কের কারণে প্রকৃত সংখ্যা হয়তো কখনও জানা যাবে না। এমনকি অনেক ভুক্তভোগীর স্মৃতিও ইতিহাসে লিপিবদ্ধ থাকবে না। ১৯৭১ সালের ১৩ জুন দ্য সানডে টাইমসে প্রকাশিত ‘জেনোসাইড’ শিরোনামের এক কলামে সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস লিখেছেন- ‘২৫ মার্চ সন্ধ্যায় যখন সেনাবাহিনীর ইউনিটগুলো ঢাকায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের অনেকের কাছেই হত্যা করার জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের তালিকা ছিল’।
১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড ওয়াশিংটনে একটি টেলিগ্রাম পাঠান। যার শিরোনাম ‘সিলেকটিভ জেনোসাইড’। সেখানে তিনি লিখেছেন- ‘পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সহায়তায় অবাঙালি মুসলমানরা পদ্ধতিগতভাবে দরিদ্র মানুষের মহল্লায় আক্রমণ চালাচ্ছে এবং বাঙালি ও হিন্দুদের হত্যা করছে’। ১৯৭১ সালের ৬ এপ্রিল, যা পরে ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে পরিচিত হয়, সেই বার্তায় কনসাল জেনারেল ব্লাড যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সরকারি নীরবতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। ঢাকার মার্কিন কনস্যুলেটের ২০ জন কূটনৈতিক কর্মকর্তা এতে স্বাক্ষর করেন। সেখানে আংশিকভাবে বলা হয়- ‘আমরা হস্তক্ষেপ না করার পথ বেছে নিয়েছি। এমনকি নৈতিকভাবেও নয়- এই যুক্তিতে যে আওয়ামী সংঘাতটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখানে ‘গণহত্যা’ শব্দটি প্রযোজ্য। ব্যক্তিগতভাবে অনেক আমেরিকান এতে ঘৃণা প্রকাশ করেছেন।’ এই প্রতিবাদের সঙ্গে আর্চার ব্লাডও একমত ছিলেন। ১৯৭১ সালের ৮ এপ্রিল কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড) আরেকটি টেলিগ্রাম পাঠান। সেখানে আংশিকভাবে বলা হয়- ‘গণহত্যা’ শব্দটি পুরোপুরি প্রযোজ্য- বিশেষভাবে হিন্দুদের লক্ষ্য করে যে নগ্ন, পরিকল্পিত এবং ব্যাপকভাবে বাছাই করে নির্যাতন চালানো হচ্ছে, তার ক্ষেত্রে।’
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর এডওয়ার্ড এম. কেনেডি মার্কিন সিনেটের বিচারবিষয়ক কমিটির শরণার্থী ও পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের সমস্যাবিষয়ক উপকমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৭১ সালের ১ নভেম্বর কমিটির কাছে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন তিনি। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে পরিকল্পিত সন্ত্রাস অভিযান শুরু করেছিল এবং যার গণহত্যামূলক পরিণতি ঘটেছে, তার চেয়ে স্পষ্ট বা সহজে প্রমাণযোগ্য আর কিছু নেই। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে পাঠানো মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন, অসংখ্য প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকের বিবরণ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন এবং উপকমিটির কাছে উপলব্ধ অন্যান্য তথ্য- সবই পূর্ববঙ্গে চলমান সন্ত্রাসের ধারাবাহিক শাসনের প্রমাণ দেয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের। তাদের জমি ও দোকান লুট করা হয়েছে, পদ্ধতিগতভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং কিছু স্থানে তাদের শরীরে ‘এইচ’ চিহ্নিত হলুদ দাগ আঁকা হয়েছে। এ সবকিছুই ইসলামাবাদ থেকে জারি করা সামরিক শাসনের অধীনে সরকারি অনুমোদন, নির্দেশ এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে করা হয়েছে।’