উপকূলের ডিএফও হাসানের জন্য টাকা তোলেন রেঞ্জার জহির | ছবি: NewsBangla.net
উপকূলের ডিএফও হাসানের জন্য টাকা তোলেন রেঞ্জার জহির জয়নাল আবেদিন (কক্সবাজার) প্রতিনিধি: চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এম এ হাসানের জন্য মামলা দেওয়া এবং বন বিভাগের সম্পত্তি অবৈধভাবে দখলদারদের হাতে তুলে দেওয়ার অভিযোগে চাঁদা তোলেন সদ্য প্রত্যাহার হওয়া চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের ছনুয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, আদায় করা ওই টাকা পরবর্তীতে তারা ভাগাভাগি করতেন। টাকা দাবির একাধিক অডিও রেকর্ড এবং টাকা গ্রহণের ভিডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের কাছে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, রেঞ্জ কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম ছনুয়া রেঞ্জে যোগদানের পর থেকেই বেপরোয়া চাঁদাবাজি শুরু করেন। তিনি লোকজনের কাছে বলে বেড়াতেন, ডিএফও এম এ হাসান তার (জহিরের) কথা অনুযায়ী চলেন। তারা দু'জনই বৃহত্তর ময়মনসিংহের লোক বলে পরিচয় দিতেন। একটি অডিও রেকর্ডে জহিরুল ইসলামকে মোবাইল ফোনে মোক্তার হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, “আমি ভালো নেই, তোমাকে মামলা দিতে হচ্ছে। তোমার সঙ্গে যে কথা ছিল, ডিএফওর জন্য ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা। টাকা না দেওয়ায় আমাকে মামলা দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।” জবাবে মোক্তার হোসেন বলেন, “আমি ঘরবাড়ি বিক্রি করে টাকা দেব। চলেন, কালকে ডিএফওর কাছে যাই। আপনার সামনে ডিএফওকে টাকা দেব।” মোক্তার আরও বলেন, “গত ১৫ বছরে অনেক ডিএফও, রেঞ্জার ও বিট কর্মকর্তা এসেছে, কিন্তু কাউকে পাঁচ টাকাও দিতে হয়নি। স্যার, আপনাদের কারণে হয়রানির শিকার হলে আল্লাহও অসন্তুষ্ট হবেন। আমি যদি সরকারি জায়গা দখল করতাম বা পেরাবন কাটতাম, তাহলে টাকা দেওয়ার বিষয় ছিল। এখন কেন টাকা দেব?” জহির জবাবে বলেন, “তুমি আসল বিষয়টা বুঝতে পারছ না। তোমাকে সারাদিন সময় দিলাম, কিন্তু তুমি কিছুই জানাওনি।” মোক্তার বলেন, “স্যার, জায়গার মালিকরা ২০২৭ সালের লাগিয়তের টাকা খুঁজছে।” জহির বলেন, “সবাইয়ের নাম দাও, সবাইকে মামলা দিই। তোমাকে বিষয়টা বুঝাতে পারছি না। আমাদের বন বিভাগের জমির ওপর একটি সংস্থার কারণে খাজনা বন্ধ হয়ে গেছে। এ বিষয়ে এসিল্যান্ডের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছি। বর্তমানে লিজে তোমার কোনো জায়গা নেই। আমরা চাই ওই জায়গায় তোমার নাম থাকুক। রেঞ্জ অফিস ও ডিএফও অফিস সমন্বয় করে কাজটি করেছি। আমি অফিসারের সঙ্গে দরদাম করে তোমার সঙ্গে কথা বলেছি। এখন তুমি সরে গেছ। অফিসার (ডিএফও) বলছেন, সব ঠিকঠাক ছিল, এখন কেন পরিবর্তন হলো। স্যার আমাকে শাপলাপুর যেতে বলেছিলেন, কিন্তু মিটিং থাকায় যেতে পারিনি। স্যারের কাছে একদিন সময় চেয়েছি। আশা করি, একদিনের মধ্যে টাকা-পয়সার ব্যবস্থা করে দেবে।” এক পর্যায়ে মোক্তার আপাতত ২০ হাজার টাকা দেওয়ার জন্য রাজি হন। তখন জহির বলেন, “আমি ডিএফও স্যারের সঙ্গে বেইমানি করতে পারি না। উনি শাপলাপুরে এলে তোমার সঙ্গে কথা বলিয়ে দেব। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২০ মে পেকুয়া বাজারে এসে মোক্তার হোসেন রেঞ্জ কর্মকর্তা জহিরুল ইসলামকে ৫০ হাজার টাকা বুঝিয়ে দেন। টাকা গ্রহণের ওই দৃশ্য একটি দোকানের সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ হয়েছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি এলাকায় ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। এছাড়া আব্বাস নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকেও ডিএফও এম এ হাসানের নাম ব্যবহার করে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে, ছনুয়া বিট এলাকায় ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে সরকারি জমি মিজান চৌধুরী নামের এক ব্যক্তির কাছে অলিখিতভাবে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপকূলীয় বন বিভাগে হাসান ও জহিরকে ঘিরে একটি চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এদিকে জহিরের কথিত চাঁদাবাজির অডিও-ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে তাকে ছনুয়া রেঞ্জ থেকে বদলি করা হলেও, তাকে রক্ষায় ডিএফও এম এ হাসান সক্রিয় রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, হাসান ও জহিরের এই সিন্ডিকেটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে পেকুয়া ও মহেশখালীর সাধারণ মানুষ অসহায় অবস্থার মধ্যে ছিলেন। একই সঙ্গে এলাকার বাসিন্দারা মনে করেন, দুর্নীতিবাজ ডিএফও এম এ হাসানের দুর্নীতির একটি খুঁটি হলো জহির। চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগে এরকম আরও খুঁটি রয়েছে, যাদের মাধ্যমে ডিএফও দুর্নীতি করে থাকেন। তাই এই ডিএফওকে অপসারণ না করা হলে উপকূলীয় বন বিভাগের কোনো সম্পদই রক্ষা পাবে না। তবে অনেক খোঁজাখুঁজির পরও অভিযুক্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা জহিরুল ইসলামের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে অভিযুক্ত ডিএফও এম এ হাসান বলেন, “ভাই, আপনি আমাকে চেনেন। আমি কেমন মানুষ! আমি আমার চাকরি জীবনে একটি টাকাও ঘুষ খাইনি। তাকে ক্লোজ করা হয়েছে। তার অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে। আমি তো চাকরি থেকে বহিষ্কার করতে পারি না, তবে স্থায়ী বহিষ্কারের জন্য সুপারিশ করব।” চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান বন সংরক্ষক মিহির কুমার দে বলেন, "বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।”